নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক নিবার্তা:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে পুরনো বিতর্ক— তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। সংবিধান থেকে এক দশকেরও বেশি আগে বাদ পড়া এই ব্যবস্থাকে ঘিরে এখন আদালত, সংসদ ও রাজপথে চলছে নতুন করে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক। মূল প্রশ্ন একটাই — নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় কে থাকবে?
এই আলোচনার সূত্রপাত উচ্চ আদালতে চলমান একটি মামলার মাধ্যমে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের পরবর্তী শুনানি আজ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনজীবী শিশির মনির জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে দাখিল করা আপিলের শুনানি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দেশের রাজনীতিক ও আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিন্নমত। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন,
“এখনকার রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটা অনেকটা কৌশলগত খেলায় পরিণত হয়েছে। কেউ সরাসরি এটা চাইছে না, আবার কেউ চাইছে এটিকে অন্য নামে প্রতিষ্ঠা করতে।”
তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বিরোধীরা কার্যত অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা চাইলেও সেটিই অনেকের কাছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিকল্প রূপ হয়ে উঠেছে।
১৯৯৬ সালে জনগণের দাবিতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যার অধীনে তিনটি জাতীয় নির্বাচন (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮) অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে, সেগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
তবে ২০১১ সালে আদালতের রায় ও সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সরকার তখন যুক্তি দিয়েছিল— অনির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
কিন্তু ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে এসে আবারও সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনীতিতে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ— বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়; তাই নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনই একমাত্র সমাধান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করলে সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে কিনা— এ প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গত ২২ অক্টোবর আপিল বিভাগের শুনানিতে এই মন্তব্য করেন তিনি।
এই মামলায় আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, যিনি ১৪তম জাতীয় নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
বিএনপি ও আরও কয়েকটি দল বলছে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনের আগে সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন,
“বর্তমান সরকারকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিতে হবে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
আইনজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলে সাংবিধানিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মন্তব্য করেন,
“মূল সংকট আস্থার। রাজনীতিতে যদি পারস্পরিক বিশ্বাস না থাকে, তবে যে ব্যবস্থাই আসুক না কেন, নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।”
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিএনপি আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা চায়।
তার ভাষায়,
“বিএনপি আমাদের কাছে নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছে। তারা চায় নির্বাচনকালীন সরকার যেন আস্থা সৃষ্টি করতে পারে।”
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“২০২৬ সালের নির্বাচনে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্যতা আনতে হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে পরিচালিত হতে হবে।”
১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, সেটিকে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়।
তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন করেছেন বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতা।
বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরুক বা না ফিরুক— মূল বিষয় হলো গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার।
যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমঝোতার জায়গায় ফিরতে না পারে, তাহলে যে ব্যবস্থাই আসুক, সংকট থেকেই যাবে।
সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ (সংবাদটি পুনর্লিখিত ও সম্পাদিত আকারে প্রকাশিত)
প্রকাশনা: দৈনিক নিবার্তা | nibarta.com

সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৫
নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক নিবার্তা:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে পুরনো বিতর্ক— তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। সংবিধান থেকে এক দশকেরও বেশি আগে বাদ পড়া এই ব্যবস্থাকে ঘিরে এখন আদালত, সংসদ ও রাজপথে চলছে নতুন করে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক। মূল প্রশ্ন একটাই — নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় কে থাকবে?
এই আলোচনার সূত্রপাত উচ্চ আদালতে চলমান একটি মামলার মাধ্যমে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের পরবর্তী শুনানি আজ (মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর আগে গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনজীবী শিশির মনির জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে দাখিল করা আপিলের শুনানি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দেশের রাজনীতিক ও আইনজীবীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ভিন্নমত। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন,
“এখনকার রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটা অনেকটা কৌশলগত খেলায় পরিণত হয়েছে। কেউ সরাসরি এটা চাইছে না, আবার কেউ চাইছে এটিকে অন্য নামে প্রতিষ্ঠা করতে।”
তার মতে, বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বিরোধীরা কার্যত অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা চাইলেও সেটিই অনেকের কাছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিকল্প রূপ হয়ে উঠেছে।
১৯৯৬ সালে জনগণের দাবিতে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, যার অধীনে তিনটি জাতীয় নির্বাচন (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮) অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে, সেগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
তবে ২০১১ সালে আদালতের রায় ও সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সরকার তখন যুক্তি দিয়েছিল— অনির্বাচিত সরকারের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা থাকা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী।
কিন্তু ২০২৫ সালের প্রেক্ষাপটে এসে আবারও সেই ব্যবস্থাকে ঘিরে উত্তাপ ছড়িয়েছে রাজনীতিতে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ— বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়; তাই নিরপেক্ষ সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচনই একমাত্র সমাধান।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করলে সংসদের ক্ষমতা খর্ব হবে কিনা— এ প্রশ্ন তুলেছেন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
গত ২২ অক্টোবর আপিল বিভাগের শুনানিতে এই মন্তব্য করেন তিনি।
এই মামলায় আবেদনকারীদের পক্ষে ছিলেন সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, যিনি ১৪তম জাতীয় নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
বিএনপি ও আরও কয়েকটি দল বলছে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচনের আগে সরকারকে পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন,
“বর্তমান সরকারকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিতে হবে। প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
আইনজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, সংবিধান সংশোধন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা সম্ভব নয়। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলে সাংবিধানিক সমাধান পাওয়া যেতে পারে।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মন্তব্য করেন,
“মূল সংকট আস্থার। রাজনীতিতে যদি পারস্পরিক বিশ্বাস না থাকে, তবে যে ব্যবস্থাই আসুক না কেন, নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে।”
আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিএনপি আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষ ভূমিকা চায়।
তার ভাষায়,
“বিএনপি আমাদের কাছে নিরপেক্ষ ভূমিকা চেয়েছে। তারা চায় নির্বাচনকালীন সরকার যেন আস্থা সৃষ্টি করতে পারে।”
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন,
“২০২৬ সালের নির্বাচনে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্যতা আনতে হলে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকেই এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে পরিচালিত হতে হবে।”
১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, সেটিকে ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দেয়।
তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন করেছেন বদিউল আলম মজুমদারসহ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতা।
বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরুক বা না ফিরুক— মূল বিষয় হলো গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার।
যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমঝোতার জায়গায় ফিরতে না পারে, তাহলে যে ব্যবস্থাই আসুক, সংকট থেকেই যাবে।
সূত্র: দৈনিক জনকণ্ঠ (সংবাদটি পুনর্লিখিত ও সম্পাদিত আকারে প্রকাশিত)
প্রকাশনা: দৈনিক নিবার্তা | nibarta.com

আপনার মতামত লিখুন