২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি—ঢাকার গৃহবন্দী এক মায়ের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক খবর। গুলশানে বন্দিদশায় থাকা সেই মায়ের পাশে তখন পরিবারের কোনো সদস্য ছিল না। মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ উপস্থিত ছিল না। তিনি ছিলেন মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যিনি সে দিন শুনেছিলেন তার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো’র মৃত্যুসংবাদ।
মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময়েই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর তিন দিন পর মরদেহ দেশে আনা হয়। বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেও রাজধানীতে তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে—যা তার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসার অনন্য প্রমাণ।
আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট, কুমিল্লায়। জন্মের পরপরই আসে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধকালীন সময়ে তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম দেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। কোকোর শৈশবের বড় এক ট্রাজেডি ছিল পাকবাহিনীর হাতে মা ও বড় ভাই তারেক রহমানের বন্দিদশার অভিজ্ঞতা।
মাত্র ১১ বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন—যা তার জীবনে গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। তবে এসব বেদনা কখনোই তিনি প্রকাশ্যে প্রকাশ করেননি; বরং নিভৃতচারী, সংযত ও অন্তর্মুখী জীবনকেই বেছে নিয়েছিলেন।
২০০৭ সালে আবারও বন্দিদশার শিকার হন। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। অবশেষে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে, মালয়েশিয়ায় তার জীবনাবসান ঘটে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। রাজনীতির বলয়ের ভেতর থেকেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়া সংগঠনের পথ—বিশেষ করে দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে।
২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে তিনি—
তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে ক্রিকেটার তৈরির শক্তিশালী পাইপলাইন, যার সুফল পেয়েছেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, শুভাগত হোমসহ বহু তারকা ক্রিকেটার।
প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হয়েও তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন—যা তার বিনয় ও সাধারণ মানসিকতার প্রতিফলন।
২০০৪ সালে তিনি মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আধুনিক ক্রিকেট ভেন্যুতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে স্টেডিয়ামটি হয়ে ওঠে ‘হোম অব ক্রিকেট’। এই অবদানই পরবর্তীতে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ সুগম করে।
এছাড়াও ক্রিকেট বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে তিনি সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বগুড়ার স্টেডিয়ামের নাম শহীদ চান্দু’র নামে রাখেন—নিজ পিতার নামে নয়—যা তার নির্লোভ ও নৈতিক অবস্থানের দৃষ্টান্ত।
তিনি কখনোই জনপ্রিয়তা বা প্রচারের পেছনে ছোটেননি। প্রেস ডেকে বাহবা নেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে আধুনিক কোচ, ফিজিও ও ট্রেনার আনার উদ্যোগ নেন—বাংলাদেশ ক্রিকেটকে পেশাদার কাঠামোয় উন্নীত করেন।
“ক্ষমতার ভেতর থেকেও ক্ষমতার মোহে না পড়া”—এটাই ছিল কোকোর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তার মৃত্যুর পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বায়তুল মোকাররম থেকে পল্টন, জিপিও, নাট্যমঞ্চ, হকি স্টেডিয়াম পর্যন্ত জনসমুদ্রে রূপ নেয় রাজধানী। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে শেষ বিদায় জানায়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতোই, কোকোর জানাজাও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
চাইলেই তিনি ক্ষমতাবান বা বিত্তবান জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ জীবন, নিঃশব্দ অবদান এবং দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
অমায়িক, নির্লোভ, প্রচারবিমুখ এই মানুষটির স্মরণে মৃত্যুবার্ষিকীতে রইলো গভীর শ্রদ্ধা।
তিনি ছিলেন—আরাফাত রহমান কোকো: নীরবে কাজ করে যাওয়া এক অমায়িক-অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬
২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি—ঢাকার গৃহবন্দী এক মায়ের জীবনে নেমে আসে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক খবর। গুলশানে বন্দিদশায় থাকা সেই মায়ের পাশে তখন পরিবারের কোনো সদস্য ছিল না। মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ উপস্থিত ছিল না। তিনি ছিলেন মরহুমা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, যিনি সে দিন শুনেছিলেন তার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকো’র মৃত্যুসংবাদ।
মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময়েই তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর তিন দিন পর মরদেহ দেশে আনা হয়। বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেও রাজধানীতে তার জানাজায় মানুষের ঢল নামে—যা তার প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসার অনন্য প্রমাণ।
আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট, কুমিল্লায়। জন্মের পরপরই আসে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধকালীন সময়ে তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম দেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। কোকোর শৈশবের বড় এক ট্রাজেডি ছিল পাকবাহিনীর হাতে মা ও বড় ভাই তারেক রহমানের বন্দিদশার অভিজ্ঞতা।
মাত্র ১১ বছর বয়সেই তিনি পিতৃহারা হন—যা তার জীবনে গভীর মানসিক প্রভাব ফেলে। তবে এসব বেদনা কখনোই তিনি প্রকাশ্যে প্রকাশ করেননি; বরং নিভৃতচারী, সংযত ও অন্তর্মুখী জীবনকেই বেছে নিয়েছিলেন।
২০০৭ সালে আবারও বন্দিদশার শিকার হন। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। অবশেষে ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি, মাত্র ৪৫ বছর বয়সে, মালয়েশিয়ায় তার জীবনাবসান ঘটে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ। রাজনীতির বলয়ের ভেতর থেকেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্রীড়া সংগঠনের পথ—বিশেষ করে দেশের ক্রিকেট উন্নয়নে।
২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে তিনি—
তার হাত ধরেই গড়ে ওঠে ক্রিকেটার তৈরির শক্তিশালী পাইপলাইন, যার সুফল পেয়েছেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, শুভাগত হোমসহ বহু তারকা ক্রিকেটার।
প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হয়েও তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন—যা তার বিনয় ও সাধারণ মানসিকতার প্রতিফলন।
২০০৪ সালে তিনি মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামকে আধুনিক ক্রিকেট ভেন্যুতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে স্টেডিয়ামটি হয়ে ওঠে ‘হোম অব ক্রিকেট’। এই অবদানই পরবর্তীতে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়োজনের পথ সুগম করে।
এছাড়াও ক্রিকেট বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে তিনি সিলেট, খুলনা, রাজশাহী ও বগুড়ায় আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বগুড়ার স্টেডিয়ামের নাম শহীদ চান্দু’র নামে রাখেন—নিজ পিতার নামে নয়—যা তার নির্লোভ ও নৈতিক অবস্থানের দৃষ্টান্ত।
তিনি কখনোই জনপ্রিয়তা বা প্রচারের পেছনে ছোটেননি। প্রেস ডেকে বাহবা নেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে আধুনিক কোচ, ফিজিও ও ট্রেনার আনার উদ্যোগ নেন—বাংলাদেশ ক্রিকেটকে পেশাদার কাঠামোয় উন্নীত করেন।
“ক্ষমতার ভেতর থেকেও ক্ষমতার মোহে না পড়া”—এটাই ছিল কোকোর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
তার মৃত্যুর পর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখো মানুষের ঢল নামে। বায়তুল মোকাররম থেকে পল্টন, জিপিও, নাট্যমঞ্চ, হকি স্টেডিয়াম পর্যন্ত জনসমুদ্রে রূপ নেয় রাজধানী। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে শেষ বিদায় জানায়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতোই, কোকোর জানাজাও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ঘটনা হয়ে আছে।
চাইলেই তিনি ক্ষমতাবান বা বিত্তবান জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সাধারণ জীবন, নিঃশব্দ অবদান এবং দেশের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
অমায়িক, নির্লোভ, প্রচারবিমুখ এই মানুষটির স্মরণে মৃত্যুবার্ষিকীতে রইলো গভীর শ্রদ্ধা।
তিনি ছিলেন—আরাফাত রহমান কোকো: নীরবে কাজ করে যাওয়া এক অমায়িক-অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

আপনার মতামত লিখুন