দৈনিক নিবার্তা

আইন-কানুন

বিডিআর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের দলগত সম্পৃক্ততার প্রমাণ: প্রধান সমন্বয়ক তাপস—স্বাধীন তদন্ত কমিশন

নিবার্তা | বিশেষ সংবাদঢাকা, ৩০ নভেম্বর ২০২৫: বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞের তদন্তে আওয়ামী লীগের সরাসরি সম্পৃক্ততার “শক্তিশালী প্রমাণ” পেয়েছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। আজ রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন।কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে অন্যান্য সদস্য—মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার (অব.), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাইদুর রহমান বীর প্রতীক (অব.), সচিব (অব.) মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, অতিরিক্ত আইজিপি (অব.) ড. এম আকবর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শরীফুল ইসলাম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন—প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেন।‘জাতি অন্ধকারে ছিল, সত্য উদ্‌ঘাটনের কাজ জাতি স্মরণে রাখবে’—প্রধান উপদেষ্টাপ্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতি দীর্ঘদিন ধরে অন্ধকারে ছিল। আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে আজ সেই অন্ধকার দূর হয়েছে। সত্য উদ্‌ঘাটনে আপনাদের ভূমিকা জাতি স্মরণে রাখবে।”তিনি আরও বলেন, এই প্রতিবেদন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘মূল্যবান সম্পদ’ হয়ে থাকবে এবং দীর্ঘদিনের বহু প্রশ্নের সমাধান দেবে।তদন্তে উন্মোচিত তথ্য: বাহ্যিক শক্তির সম্পৃক্ততা, আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত ভূমিকাকমিশন প্রধান ফজলুর রহমান জানান, ১৬ বছর আগের ঘটনার বহু আলামত নষ্ট হয়ে গেলেও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করা হয়েছে। শত শত সাক্ষীর সাক্ষ্য, বিভিন্ন সংস্থার পূর্বতন তদন্ত, নথি, ও উপাত্ত সংগ্রহ করে ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র পুনর্গঠন করা হয়।তিনি জানান— বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের দলগত সম্পৃক্ততা ‘শক্তভাবে নিশ্চিত’ হয়েছে। ‘প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন শেখ ফজলে নূর তাপস’—কমিশনের ফাইন্ডিংসকমিশনের সদস্য জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার প্রতিবেদনের তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি দিক তুলে ধরে বলেন— হত্যাকাণ্ডটি ছিল পরিকল্পিত, এবং এর প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন এমপি শেখ ফজলে নূর তাপস। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা ঘটনার দিন পিলখানায় মিছিল নিয়ে প্রবেশ করে এবং পরে সেই মিছিলের আকার বেড়ে দুই শতাধিক লোক হয়। ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। দায় নিরূপণে তৎকালীন সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সবাই ব্যর্থতার ভার বহন করেন। পুলিশ, র‌্যাব, এবং গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতাও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। মিডিয়ার অপেশাদার ভূমিকা ও তথ্য সংরক্ষণে গাফিলতিকমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী— কয়েকটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া অপেশাদার আচরণ করেছে। যমুনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যেসব বিডিআর সদস্য বৈঠক করেছিলেন, তাদের নাম-পরিচয় সংরক্ষণে গাফিলতি ছিল। ভবিষ্যৎ সুপারিশপ্রতিবেদনে বাহিনীসমূহে শৃঙ্খলা রক্ষার উন্নয়ন, বিদ্রোহ প্রতিরোধ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে।বৈঠকে উপস্থিত ছিলেনজাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি উন্নয়ন বিষয়ক বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি। এই প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্য দিয়ে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো নতুনভাবে সামনে এসেছে। জাতীয় জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের পথে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের দলগত সম্পৃক্ততার প্রমাণ: প্রধান সমন্বয়ক তাপস—স্বাধীন তদন্ত কমিশন